“চোখে দেখেন না,” তবুও ১৬ বছর ধরে ছড়িয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার আলো!


“চোখে দেখেন না,” তবুও ১৬ বছর ধরে ছড়িয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার আলো!
ফরিদ-পুরের বোয়ালমারী পৌর সদরের গণিতের শিক্ষক (মো: শওকত আলী)। তিনি ‘প্রাইভেট শওকত মাস্টার, নামেই বেশি প,রিচিত।

অনেকে ‘লোকাল শওকত মাস্টার,’ নামেও তাকে চেনে। শওকত আলী চোখে দেখেন না। তারপরও দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন শিক্ষার আলো। করোনার প্রাদুর্ভাবে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ. থাকায় মানবেতর জী,বনযাপন করছেন মানুষ গড়ার এই কারিগর।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পা,রিবারিক অসচ্ছলতার কারণে নিজে পড়ালেখা করতে পারেননি বেশি দূর। কিন্তু এ পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই হাজার দুর্বল মেধাসম্পন্ন শিক্ষা,র্থীকে দিয়েছেন পথের দিশা।

২০০৫, সালে হঠাৎ দৃষ্টি,শক্তি হরিয়ে ফেলেন তিনি। চোখের রেটিনা নার্ভ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়ায় অন্ধত্ব বরণ করেন, এ মেধাবী শিক্ষক। বাংলাদেশ ও ভারতের মাদ্রাজে চিকিৎসা নিয়েছেন বেশ কয়েকবার। নিজের যা সঞ্চয় তার সবটা ঢেলে দিয়েও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি দৃষ্টিশ,ক্তি। অবশেষে অর্থের অভাবে আর চিকিৎসা, করানো সম্ভব হয়নি।

প্রগাঢ় আ,ত্মমর্যাদাবোধ বাধা দিয়েছে কারও কাছে হাত পাততে। তাই উন্নত চিকিৎসার অভাবে ধীরে ,ধীরে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছেন তিনি।
তারপরও থেমে নেই তার জ্ঞান ছড়ানোর ব্রত। অ,ন্ধত্ব নিয়ে এখনো পড়ান শওকত আলী।

দিব্যি ব্ল্যাকবোর্ডে কষে যান গণিতের জটিল জ,টিল সমাধান। শিক্ষার্থীর দুর্বল দিককে চিহ্নিত করে মেধা অনুযায়ী সহজ পাঠদান করে উপযুক্ত করে গড়ে তোলাই এ শিক্ষকের বড় সাফল্য। এ,জন্য অনেক অভিভাবক এখনো তাদের দুর্বল ছেলেমেয়ের ‘পথের দিশারী’ হিসেবে তাকেই বেছে নেন।

আশির দশকে মাগুরা থেকে এ,কটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে বোয়ালমারীতে আসেন শওকত আলী মাস্টার। আত্মীয়তার সূত্রে উপজেলা সদরের মরহুম ,শেখ আক্কাচ আলীর, পরিবারের সদস্যদের পড়ানোর দায়িত্ব নেন সে সময়। তার তত্ত্বাবধানে এ পরিবারের সবাই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৮৬ সালে এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ১০ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়ে কোচিং করান। পরবর্তী বছর প্রত্যেকে ভালো ফলাফল করলে নাম ছড়িয়ে পড়ে তার। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। থেকে যান বোয়ালমারীতেই। পেশা হিসেবে বেছে নেন প্রাইভেট শিক্ষকতা।

সে সময় প্রতিবছর মেধাবী শি,ক্ষার্থীদের পাশা,পাশি এসএসসিতে অকৃতকার্য দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভিড় জমতে থাকে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের কাছেও ভরসাস্থল হয়ে দাঁড়ান ,শওকত আলী। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য নিজ ভাড়া বাসায় গড়ে তোলেন আবাসিক কোচিং ব্যবস্থা।

আবাসিক-অনাবাসিক মিলে কোনো কোনো বছর ১০০. থেকে ১৩০, জন শিক্ষার্থীকে ব্যাচ করে পাঠদান দিতে হতো। শিক্ষার্থীদের ভিড়ে এক সময় খাওয়ার সময় না পেলেও অন্ধত্ব বরণের পর থেকে ধীরে ধীরে কমে আসে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। বর্তমানে ১০-১২ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়িয়ে অতিকষ্টে দিন পার করছেন, তিনি।

শওকত আলী মাস্টারের হাতে শিক্ষার আলো নেয়া অ,নেকেই এখন সমাজে প্র,তিষ্ঠিত। এদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন বিসিএস ক্যাডার, এমবিবিএস ডাক্তার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংক কর্মকর্তা, জ,নপ্রতিনিধি, পুলিশ অফিসার, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

করোনার, প্রাদুর্ভাবে সারা দেশে শিক্ষা,প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবেই শি,ক্ষার্থীর সংখ্যা কমে আসে। এখন মাত্র ১০-১২, জন শিক্ষার্থীকে পড়ান শওকত আলী। এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে এ শিক্ষকের। মে,য়ের বিয়ে হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। ছেলেও বিয়ে করে স্ত্রীসহ ঢাকায় থাকেন। একটা প্রা,ইভেট কোম্পানিতে চাকরি করলেও যা বেতন পান তাতে তার সংসার চলাতে কষ্ট হয়।

এখন ছাত্র,ছাত্রী কমে যাওয়ায় বাসা ভাড়ার টা,কাও পরিশোধ করতে কষ্ট হয় এই শিক্ষকের। শওকত আলী মাস্টার জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিজের বা সংসারের কথা চিন্তা করিনি। কয়েক বছর গ,রিব ছে,লেমেয়েকে বিনাবেতনে পড়িয়েছি। এসএসসিতে ফরম পূরণ করতে না পারা ছাত্রছাত্রীদের নিজের টাকা দিয়ে ফরম পূরণ করতে স,হযোগিতা করেছি। এখন নিজেই চলতে পারি না। দিন চলে খেয়ে না খেয়ে। সত্যি বলতে কি ভী,ষণ কষ্টে আছি।

৫ নম্বর বোয়ালমারী ইউনিয়ন প,রিষদের (ইউপি) ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, আমি জন্মের পর থেকে দেখছি শওকত স্যারকে। আ,মি উনার কাছে পড়েছি। তিনি একজন মেধাবী মানুষ। তিনি বোয়ালমারীতে ‘লোকাল শওকত’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে আমি ক্লাস ষষ্ঠ শ্রে,ণি থেকে শুরু করে এসএসসি পর্যন্ত লে,খাপড়া করি স্যারের কাছে। তিনি সব বিষয়ে পারদর্শী।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে স্যার গণিত বিষয়ে পড়াতেন। তার জন্যই আজ আমি আইসিটি বিভাগের বোয়ালমারী সদর ইউনিয়ন ডিজিটাল সে,ন্টারের উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করতে পেরেছি। আমি আমার স্যা,রের জন্য দোয়া প্রার্থনা করি।

বো,য়ালমারী পৌর সদরের বাসিন্দা ও ফরিদপুর জজ কো,র্টের আইনজীবী শেখ সেলিমুজ্জামান রুকু জাগো নিউজকে বলেন, তিনি একজন মানুষ গড়ার কারিগর। জীবনের অন্তিম সময়েও শি,ক্ষার সুধা বিলিয়ে যাচ্ছেন। শারীরিকভাবে অক্ষম হয়েও তার এ প্রচেষ্টা গর্বের।

শওকত আলী মাস্টারের ভাড়া বাসার মালিক ,,শাহিনুজ্জামান খান,, ডেবিট বলেন, আমাদের বা,ড়িটিতে তিনি প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে ভাড়াটিয়া হিসেবে আছেন। শিক্ষকতা পেশায় তিনি নিজেকে নি,য়োজিত রেখে সমাজে আলো ছড়াচ্ছেন। তার নিজের ভিটেমাটি বলতে কিছুই নেই। তাই আমরা কখনো তাকে সরাই না, ভা,ড়ার জন্য চাপ দেই না। তিনি তার সাধ্যমতো যা দিতে পারেন তাই নেই।

স,মাজের বিত্তবানরা যেন মানুষ গড়ার এই কারি-গরের পাশে দাঁড়ান সেজন্য সবার প্র,তি আহ্বান জানান “শাহিনুজ্জামান”,।

এন কে বি নয়ন/এসআর/এমএস

About jacob done

Check Also

আগামী নভেম্বরে এসএসসি, ও ডিসেম্বরে এইচএসসি, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে -বলেন শিক্ষামন্ত্রী।

আগামী নভেম্বরে এসএসসি ও ডিসেম্বরে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে -বলেন শিক্ষামন্ত্রী। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রাথমিক, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *